অন্ধকার একটা ঘর। নিস্তব্ধ শ্বাসরুদ্ধকর নিঃসঙ্গ অসহায় আপনি বসে আছেন ঘরের এক কোণে মাথা নিচু করে। জীবনের নানা প্রতিকূলতা আপনাকে চেপে ধরেছে। আপনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় আপনার জানা নেই। ঠিক একই সময় রমাদন আপনার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছে। এটাই সময়! কারন এই মাস হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লার নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা এই মাসে প্রতিটা মূহুর্তে দান করছেন খায়ের-বরকত ও অফুরন্ত কল্যাণ। মনের দরজা জানালা গুলোকে উন্মুক্ত করে দেওয়ার মত এই সুবর্ণ সুযোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখা যায় না।
কুরআন নাজিলের মাস। এই মাসেই পূর্ণ কুরআন লাওহে মাহফুজ থেকে একসঙ্গে প্রথম আসমানের "বাইতুল ইজ্জতে" অবতীর্ণ হয়। আর এতেই কি কল্যাণ নিহিত নয়!
জান্নাতের দরজা গুলোকে খুলে দেওয়া হয়েছে। আপনার মনের দরজা অবদি প্রসস্থ করে দেওয়া হয়েছে। আর একজন ঘোষক অবিরাম ঘোষণা দিচ্ছে — হে কল্যাণ প্রত্যাশী! অগ্রসর হও ; হে অকল্যাণের প্রত্যাশী! থেমে যাও। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা এই বরকতময় মাসে নিজ হাতে অসংখ্য জাহান্নামিকে মুক্তি দান করেন। তাই নিজেকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের তরে সাজানোর এই সুবর্ণ সুযোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখা যায় না। দরজাটা খুলে নিজেকে এক অদ্ভুত আলোয় বরন করে নিন। এতেই তো রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ।
নিস্তব্ধ নিবিড় রাত্রি। ঘুমে আচ্ছন্ন শহর ; ঘুমন্ত আপনার প্রিয়োজনেরাও। কিন্তু আপনি জেগে উঠেছেন "সালতুল লাইল" বা তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের জন্য, যার অর্থই হল "ঘুম থেকে উঠে নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়া"।
আপনি জেগে উঠে অনুভব করলেন এক অপার্থিব আনন্দ বিরাজ করছে হৃদয় ও মন জুড়ে। কারন আপনি জানেন এই মূহুর্তে সমগ্র বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক খুব কাছে আছেন আপনার। তিনি তো সেই সুমহান সত্তা যার অপরিসীম রহমের অতল গহব্বরে ডুবে আছেন আপনি; না চাইতেও তার অগণিত সব অনুগ্রহ উপভোগ করতে পারছেন। তাই সে সৃষ্টিকর্তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশে উন্মুখ হয়ে আছেন। আপনার রমজানকে রাঙানোর এই সুযোগ থেকে বিরাগ করা যায় না।
আপনি ভালবাসার স্রষ্টার সাথে নিভৃতে যে সময় কাটাতে চাইছেন তার উপযুক্ত সময়তো এখনই। কারন সেই সপ্তম আসমান থেকে পৃথিবীর একদম নিকট আসমানে এসে তিনি যে আপনাকে ডাকছেন; আপনাকে সম্ভাষণ জানিয়ে বলছেন,"কে আছো এমন যে আমাকে ডাকবে;" "আমি তার ডাকে সারা দিব"।
তাইতো আপনি আরামের বিছানা ত্যাগ করার জন্য মনে মনে উদ্ধুদ্ধ হলেন, স্বরণ করলেন নিজের প্রতি করা অসংখ্য জুলুমের কথা; জীবনের কতশত ভুল কত অজস্র পাপের কথা! মনে হতেই চোখ ভিজে উঠলো। আপরাধ বোধে ছেঁয়েগেল মন। কিন্তু আপনি জানেন আল্লাহ হলেন "রহমানুর রহীম" পরম করুণাময়, অতিশয় দয়ালু। তার নগণ্য তুচ্ছ এক দাস হয়ে প্রতি মূহুর্তে তার অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়ার পরেও তিনি বারবার তার কাছেই ফিরে আসার আহবান জানাতে থাকেন আপনাকে। তার দিকভ্রান্ত গাফেল বান্দাদের অবিরাম ক্ষমতাশীলতার ঘোষণা দিয়ে মহিমান্বিত প্রভু ডাকতে থাকেন, কে আছো এমন যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে! আমি তাকে ক্ষমা করে দিব।
গহীন রাতের স্নিগ্ধ এই সময়ে প্রিয় প্রভুর সাথে একান্তে নিভৃতে কিছু সময় কাটানোর এই সুবর্ণ সুযোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখা যায় না। তাই পবিত্র হয়ে তার সামনে দাঁড়ালেন। আপনার যে কতকিছু বলার আছে, কতকিছু চাওয়ার আছে। যত দুঃখ যন্ত্রণা বেদনা একমাত্র তিনিই তো দূর করতে সক্ষম। সকল বিপদাপদ থেকে মুক্তি দানকারী, সমস্যা সমাধানকারী তো এক আল্লাহই তিনি সর্বোশ্রতা, সর্বোদ্রষ্টা ও সর্বোচ্চ সাহায্যকারী। প্রেমময় প্রভু এই নির্জন রাতে এতটা কাছে এসে আপনার জন্যই তো অপেক্ষা করছেন, বারংবার বলে যাচ্ছেন, আছো কি কেউ এমন যে আমার কাছে কিছু চাইবে! আমি তাকে তা দিয়ে দিব।
বিশিষ্ট সাহাবী আবু হুরাইরা(রঃ) থেকে বর্ণিত, এভাইবেই প্রতি রাতের শেষ তৃতিয়াংশে স্বয়ং মহান আল্লাহ দুনিয়ার নিকটতম আসমানে এসে এভাবে তার বান্দাদের ফজরের আগ পর্যন্ত ডাকতে থাকেন, তাদের সুযোগ দিতে থাকেন।
রসূল (সাঃ) বলেছেন, নিশ্চই রাতে এমন একটি সময় রয়েছে যে সময়ে যদি বান্দা আল্লাহর নিকট দুনিয়া ও আখিরাতের কোনো কল্যাণ প্রার্থণা করে থাকে তাহলে সেটা তাকে অবশ্যই দেওয়া হয়।
রসূল (সঃ) এর নবুয়তের প্রথম পর্যায়ে ইসলাম প্রচারের গুরুভাব অর্পণ করার পর তারউপর তাহাজ্জুদের নামাজ ফরজ করে দিয়ে ছিলেন। ইসলাম প্রচারের এই সুকঠিন দায়িত্ব পালনে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক আরও সুগভীর করতে তাহাজ্জুদের নামাজ সাহায্য করেছিল।
ওহী নাজিলের শুরুর দিকের সুরা "সূরা মুজাম্মিল" এ আল্লাহ হায-যাওয়াল বলেন," হে চাদরাব্রিত শয়নকারী! " রাতের বেলা নামাজে রত থাকো; তবে কিছু সময় ব্যাতিত; অর্ধেক রাত কিংবা তারছেয়ে কিছু কম করো অথবা তারউপর কিছু বাড়িয়ে নাও আর কুরআন পাঠ করো তার দিল সহকারে।"
হেরাগুহায় সর্বপ্রথম ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর নবুয়তের গুরুভাবে রসূল (সঃ) এতটাই চাপ অনুভব করেছিলেন যে, বাড়ি ফিরে এসে "উম্মুল মুমিনিন" খাদিজা (রাঃ) কে বলেছিলেন, "আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও"। সেইদিকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত প্রতিপূর্ণ ভাবে আল্লাহ বলেছেন, "হে মুজাম্মিল" অর্থাৎ হে চাদরাব্রিত শয়নকারী!
রসূল (সঃ) বলেছেন, তোমরা বেশি বেশি করে রাতের নামাজ আদায় করো, খাবার দাবার দান করো ও আত্নীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো, তাহলে খুব সহজে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। আপনার রমজানকে কাজে লাগাতে এর কোনো জুড়ি নেই।
এই নামাজকে আরও সহজ করে দেওয়া হয়েছে আমাদের জন্য। আমরা ফজরের একটু আগে উঠেও দুই রাকাত নামাজ আদায় করে আল্লাহর পূর্ণ রহমতে নিজেদের জড়িয়ে নিতে পারি।
কিন্তু রমজান মাসে এটার একটা সুবিধার দিক রয়েছে। আপনাকে যখন উঠতেই হবে তখন কেন আরেকটু আগে উঠে এই বরকতময় নামাজ আদায় করে নিজেকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া থেকে বঞ্চিত করবেন!
কেউ জানেনা তার কৃতকর্মের জন্য কি কি নয়ন প্রিতিকর প্রতিদান লুকায়িত আছে। সতকর্মশীল মু'মীন, মুহসিনীত বান্দাদের দলে সামিল হওয়ার জন্য আমরা আমাদের নিজেদের গড়ে তুলছি তো!
- মোঃ রাইসুল ইমাম